"আকাশ হয়ে ওঠো । মেঘলা দিনের
আমি বলেছিলাম "আকাশ হতে পারি মেঘলা
দেখতে পাওনা খড়ের চাল চুঁইয়ে
মাদুরের উপর সুখনিদ্রার আয়োজন
তুমি মুখ গোমড়া করে বলেছিলে
জলতরঙ্গের বাজনা শুনতে পায়
তা তোমার অন্তরমহলে নেই ।"
আমি হেসে বলি " ,তিরস্কারের বৃত্তে আমায়
সংকোচের টানে কেন্দ্রবিন্দুতে
তারচেয়ে আমায় শরতের আকাশ হতে বলো ,
ফুরফুরে তুলোর পাঁজার বা পালকের মত
আমার সাথে গা লাগিয়ে সোহাগ না করলে
আকাশ মেঘের বায়নাক্কা মেটাতে গিয়ে
তোমার অনাদর সহ্য হবে না ।
তার চেয়ে একটা গল্প বলি শোনো ,
চুলবুল না করে চুপটি করে বসো ।
কপালের ঝুরো চুলগুলো থাকলেও ভাল
নইলে জোরে শ্বাস নিলে ওই তোমার
চন্দনের আভাস কি করে পাই ?"
শরৎ পেরিয়ে হেমন্ত পাতা ঝরাতে
গেলাম তামাপাহাড়ীর ওই পাকদন্ডীর জঙ্গলে,
কেউ মাটিতে মিশে আছে কেউ একটু মাথা
তুলে আর বাড়বে কিনা বুঝতে পারছে না
কেউ কুছপরোয়া না করে চারদিকে ডালপালা ছড়িয়ে
তা হেমন্তের বায়নাক্কা মেটাতে গিয়ে
তাদের পাতা ঝরছে তো ঝরছেই ।
পেলব বিষণ্ণ ,কর্কশ লাবণ্য ,
কেউ সূচোলো , কেউ বৃত্তকলায় অনন্য
স্বয়ং ইউক্লিড ও অমন রেখার রকমফের ভাবতে পারবেন না ।
কেই বা কখনো পেরেছে প্রকৃতির উপর
কিছু খবরদারি করতে ? সে তো
সর্বত্রগামিনী সর্বকর্মপটীয়সী।
পাহাড়চূড়ায় গিয়ে যখন পৌঁছলাম তখন
একটা ঝোপড়া গাছের ছায়ায় আরাম করে বসলাম,
সামনে ফাঁকা জায়গায় ঝরা পাতার রাশি ।
মাঝে মাঝে মাথা তুলেছে শাল সেগুনের চারা ।
আকাশটা ঝকঝকে নীল । মাথার উপরে সূর্য
সারাদিন জ্বলেপুড়ে রাঙ্গা হয়ে উঠেছে ।
ওমনি সামনের জঙ্গলটা নড়ে উঠলো ।
গাছপাতা সরিয়ে সে সামনে এসে দাড়ালো ।
লম্বা দোহারা চেহারা ।একগাল দাড়ি । একটা হেটো ধুতি বেশ মালকোচা মেরে পরা ।খালি পা । আর তার উজ্জ্বল দুই চোখ । হা করে তাকিয়ে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করলাম
[ ] তা এখানে একটু বসো না কেন !
[ ] "তা বটে । একটু জিরোনোও হবে,"
[ ] " কিন্তু রোদটা বড় তাপ দিচ্ছে ।গায়ে কেমন জ্বালা হচ্ছে না ?"
[ ] আমি মাথা হেলিয়ে সায় দিতে সে মাথা হেলিয়ে উপরপানে চেয়ে দেখলো
[ ] হঠাৎ কেমন রোদটা কমে গেলো ।
[ ] তাকিয়ে দেখি একটুকরো জলভরা মেঘে সূয্যি ঢাকা
[ ] ভগবান নির্বিকার বসে ।
[ ] বললাম "খিদে পায় নি ?"
[ ] কেমন আশ্চর্য হয়ে সে তাকালো ।বললো "খুব খিদে পেয়েছে ।"
[ ] টিফিনকৌটো বের করে লুচিতরকারির অনেকটা ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে নিজে ও খেতে লাগলাম ।কি তৃপ্তি করে ভগবান খাচ্ছিলো । এত সুখ খেয়ে হয় ? কি জানি সেদিনের সেই রোজকার বানানো লুচিতরকারি কেমন করে অমৃত হয়ে উঠলো ।
[ ] ভগবানবললো "ঠিক কথা " ।আকাশের দিকে মুখ করে দুজনে ই শুয়ে পড়লাম ।শুকনো খরখরে পাতা আর নুড়িপাথরের সেই শয্যা কেমন কোমল ন্ররম হয়ে উঠলো ।খালি একটু হাওয়া পেলে হতো ! কেউ হাসলো ।ঘাড়ঘুরিয়ে দেখি ভগবানের প্রসন্ন মুখ । চোখ বুঁজতেই তাপ কমে এলো ।ফুরফুরে হাওয়া বইতে লাগলো । একটু একটু করে ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম ।
[ ] কতক্ষণ পরে ঘুম ভাঙ্গলো জানি না ।রোদ পড়ে এসেছে । ভগবানের চিহ্ন নেই ।আমার পাশে শুকনো পাতার রাশি স্পর্শচিহ্নরহিত ।কখনো কেউ সেই শুকনো পাতার উপর শুয়েছে বলে মনে হয় না ।হঠাৎই সেই জলভরা মেঘটা ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরতে লাগলো । শুকনো পাতার উপর জলের ফোঁটা পড়তে কেমন পায়ের শব্দের মত বেজে উঠলো ।আমার বুকের মধ্যে সেই গভীর মর্মভেদী চোখ জেগে রইলো ।সমস্ত গাছপালারা হেসে আকুল হয়ে উঠলো ।খুব ঠকে গিয়েছি । কেউ এসেছিল তা বুঝতে পারিনি । হেমন্তের এই পাতাঝরা বিকেলে তার সাড়া পেয়েছি । ধীরে ধীরে নেমে এলাম পাকদন্ডী বেয়ে ।বাড়ি ফিরে কাউকে কিছু বললাম না ।টিফিনকৌটো বেসিনে নামিয়ে রাখতে গিয়ে তেমন হাল্কা বোধ হলো না ।খুলে দেখি ভর্তি । লুচিত্ররকারি কেউ ছুঁয়েছে মনে হয় না । "
[ ] যত বানানো গল্পে তোমার আনন্দ তাই না ?
[ ] একটু চুপ করে থাকা , একটু নৈঃশব্দ্য ।
[ ] তারপরে একটা শ্বাস ফেলার শব্দ ।
[ ] একটা কোমল হাত আমার হাত জড়িয়ে
ধরলো ।"আমাকে একদিন ওই পাহাড়চূড়ায় নিয়ে যাবে ? কে জানে আবার যদি ভগবানের দেখা পাই ।"
[ ] হ্যাঁ একদিন আবার আমরা ওই পাহাড়চূড়ায় যাবো । একদিনের জন্য হলেও আমি আকাশ হবো ।