অজানেয় অশ্ব অশ্বপালকের সঙ্গে অশ্বশালার অভিমুখে অগ্রসর হল। উজ্জ্বল আলোকে তার সিক্ত শরীরে লেগে থাকা জলবিন্দু দর্পণের মত ঝলমল করে উঠলো। নবীন যুবক পত্নীর করধারণ করে অবকাশগৃহের দিকে অগ্রসর হলেন।উপলবিস্তৃত উদ্যান পথ তরুলতামন্ডিত আচ্ছাদনে ঢাকা।বরষাবিন্দুর ক্ষণিক উঁকিঝুঁকি ,বর্ষা পুলকিত সুবাসিত বাতাস সর্বাঙ্গে স্নেহপরশের রোমাঞ্চ জাগায়।
মেঘবালক আর মেঘবালিকার দল পুঞ্জীভূত মেঘের মত নবদম্পতিকে ঘিরে ধরে উচ্চকিত হাসিতে বিস্ফোরিত হয়ে উঠলো।তাদের সেই কৌতুকবিস্ফোরিত হাসি অনুচ্চ রঙ্গকোলাহলের মত নবদম্পতির শ্রবণে মধুপগুঞ্জনে্র মত ভেসে এলো।তারা চকিত হয়ে আর কিছু শুনবার আশায় উন্মুখ হয়ে উঠলেন।মেঘবালক বালিকার দল সতর্ক শৃঙ্খলায় নীরব হয়ে একটু ঘনীভূত হয়ে উঠলো আর নিঃশব্দে নবদম্পতির দৃষ্টিসীমার অতীত হলেন।নববধূর সমস্ত শরীরে মনে বাতাসে মিশে থাকা এক অচেনা নির্মল অস্তিত্বের এক অপার্থিব আভাস এক অচেনা ঐন্দ্রজালিক রাগের মত বেজে উঠলো।দয়িতের করধারণ করে তিনি বলে উঠলেন,"জানো কেউ যেন আছে।অনন্ত অনুরাগের ভান্ডার নিয়ে কারা যেন দাড়িয়ে আছে।ও্ররা সেই অমৃত আমাদের দিতে চায়।"
স্বপ্নাদিষ্টের মত যুবক বলে উঠলেন,"চলো আমরা সেই মধুভান্ডের জন্য প্রার্থণা করি।আজ আকাশ বাতাস ভূলোক দ্যূলোক স্বর্গ মর্ত্য পাতাল মধুময় হোক।মধুবর্ষণে নদীভান্ড উছলে উঠুক।পূ্র্ণ হোক জলাধার সরোবর কূপসকল।পর্বতশিখরে বিদ্যুৎ ঝলসাক।নতশির বৃক্ষরা স্নাত হোক।বৃক্ষতলে তৃণপুস্পের মেলায় বরষাশেষে মধূপ ভ্রমর প্রজাপতি পতঙ্গে্র ক্রীড়াস্থল হয়ে উঠুক।আর এই মধুচাঁদের আলোয় বরষাবিরতিতে এসো আমরা সেই অপার্থিব আনন্দময় আর আনন্দময়ীদের আনুকূল্য প্রার্থণা করি।"
এই বাক্যালাপের মধ্যে তারা উদ্যানপথ অতিক্রম করে উদ্যানবাটিকার সোপানে পা রেখেছেন।পরিচারক পরিচারকেরা সহাস্যমুখে তাদের চন্দনসুরভিত অঙ্গবস্ত্র দিয়ে অভ্যর্থণা করলো।অবকাশগৃহের অভিমুখী পথ আলপনা চিত্রশোভায় শোভিত।একটু হেঁটে তারা কক্ষে প্রবেশ করলেন।সুসজ্জিত কক্ষে উজ্জ্বল দীপালোকে দেওয়ালগাত্রে অঙ্কিত মধ্যদেশীয় শিল্পীর অপূর্ব নিসর্গচিত্র।এককোনে রাখা গন্ধপ্রদীপের উপর একমুঠো চন্দনচূ্র্ণ নিক্ষেপ করে পরিচারিকারা চলে গেল।কোমল চন্দনবাসে বাতাস আমোদিত হয়ে উঠলো।বধূ স্নানকক্ষের দিকে অগ্ৰসর হলেন।
এমন সময় পরিচারিকা এসে এক বার্তাপত্র যুবকের হাতে তুলে দিল।অঙ্গবস্ত্র উন্মোচন করে যুবক অন্যমনস্কভাবে পরিচারিকার দিকে তাকালেন।সে অঙ্গ বস্ত্র নিয়ে যুবককে জিজ্ঞাসা করলো,"অকালবর্ষণের ধারায় সিক্ত হয়েছেন।একটু উষ্ণ পানীয় দি?" যুবক
সম্মতিসহকারে শিরসঞ্চালন করে পত্রে দৃষ্টিপাত করলেন এবং চমকিত হয়ে উঠলেন। যুবরাজ স্কন্দগুপ্তের পত্রাদেশ।কটিদেশে অসিবন্ধন করে উষ্ণীষ পরিধাণ করে সুন্দর তালি বাজালেন।পানীয়পাত্র নিয়ে পরিচারিকা প্রবেশ করলো।পানীয়ে এক দীর্ঘ চুমুক দিয়ে সুন্দর বললেন,"সম্রাটের মন্ত্রণাকক্ষে যাচ্ছি।দেবিকে জানিও"।অশ্বপালক গৃহদ্বারে।"চিত্রককে প্রস্তত করেছি।" সুন্দর খু্শী হলেন।
শিক্ষিত অশ্ব চিত্রক।ধীর পদক্ষেপে উদ্যানগৃহ অতিক্রম করে বাইরে এলো।তারপর দ্রুত গতি বাড়ালো।সুন্দরের প্রভু কোন অজুহাত সহ্য করেন না।কালক্ষেপ পছন্দ করেন না।
আকাশ জুড়ে মেঘের ঘনঘটা।প্রমত্তপদসঞ্চারে দিকপালেরা মরুৎ ও পর্জণ্যদেবের সহায়তা করছেন।ইন্দ্রদেবের বজ্রনিক্ষেপ শুরু হতেই অশনিআঘাতে কেঁপে উঠলো নগরপরিসর।রক্ষীরা চমকিত হয়ে আচ্ছাদনের আশ্রয় নিলো।মেঘবালক বালিকারা অশনিআলোকে চমকিত হয়ে দেখল নবীন যুবক দ্রুত অশ্বচালনা করে রাজসকাশে চলেছে।প্রবল বরষায় আচ্ছন্নদৃষ্টি অশ্ব ধাবমান।রাজপথের আলোকমশাল নির্বাপিতপ্রায়।মেঘবালকেরা সন্তর্পণে সুন্দরকে ঘিরে ধরে তেজবৃষ্টি ও বায়ুর প্রভাব নিয়ণ্ত্রণ করলো।সহসা আচ্ছন্নদৃষ্টি পরিস্কার হতে যুবক আশ্চর্য হলেন।তারপর ভাবলেন যে আজ গোটা দিনটাই আশ্চর্য চমকে ভরা।
নববধূ স্নান শেষে ফিরে এসে শুনলেন যে রাজকার্যে যুবক নিস্ক্রান্ত হয়েছেন।প্রত্যাবর্তন অনিশ্চিত।পরিচারিকা পানীয় এনে দিলে বধূ হৃষ্টচিত্তে পান করলেন।তারপর জানালার কাছে দাড়িয়ে বরষাবিজড়িত আকাশে বিদ্যুন্মালার সঞ্চারণ দেখতে দেখতে শিহরিত হলেন।তার প্রফুল্ল হাসির ছোঁয়া মেঘবালিকাদের অন্যমনস্ক করে তুলল।উচ্চ আকাশের বরষারঙ্গ ছেড়ে তারা অবকাশগৃহের জানালার সামনে নেমে এলো।অন্যমনস্ক বধূ সহসা মেঘের স্নিগ্ধসুবাসে আহ্লাদিত হয়ে উঠলেন।ধীরে ধীরে তিনি মেঘদূতম কাব্যের পূ্র্বমেঘ পর্বের আবৃত্তি করতে লাগলেন।পরিচারিকারা এই চমৎকার ছন্দসুরের মায়ায় আবদ্ধ হয়ে নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে লাগলো।মেঘবালিকার দল স্তব্ধবিস্ময়ে যক্ষের বিরহকাতর আক্ষেপের অংশীদার হয়ে উঠলো আর পরস্পর বলতে লাগলো,"হায় যক্ষ,বিগতমহিমা হয়ে ও তুমি কি প্রেমে মগ্ন।ধন্য তোমার প্রিয়া যিনি তণ্বী শ্যামা মধ্যে ক্ষীণা স্তনেরভারে ঈষৎ অবনতা শিখরীদশনা,।তোমার নির্বাসনকাল অতিক্রান্তপ্রায়।মিলনমেদুরকাল আসছে।"
আবৃত্তি করতে করতে বধূর পূ্র্বকথা স্মরণে এলো আর সুদূর দক্ষিণদেশে তার প্রাসাদগৃহ,সখীদল,অনুজ,পিতা,পিতামহী,সর্বোপরি তার মায়ের কল্যাণস্পর্শ স্মরণে এসে অশ্রুবিন্দুর বরষণ শুরু হলো।মেঘবালিকারা পরম মমতায় তার কপোল স্পর্শ করলো।বয়ে নিয়ে এলো বৃষ্টিচ্ছটা বাস্পবিন্দুর মত।বড় মনোরম বড় আনন্দময় এই শীকরস্পর্শ।সমস্ত বৃক্ষপল্লবের সুরভি,সমস্ত স্নাতসিক্ত পুস্পের সৌরভ যেন এক আন্দধারার মত ধেয়ে এসে চারদিক ঘিরে ধরলো।ভূমি সিক্ত ও সরস হয়ে এক স্নিগ্ধ অনন্য মেঠো সুরভির জন্ম দিলো।ধীরে ধীরে মেঘ অবসৃত হয়ে উজ্জ্বল চন্দ্রালোকে জগৎ নিমজ্জিত হলো।মেঘবালিকারা সেই চাঁদের পাশে নেশাগ্ৰস্তের মত ভাসতে লাগলো।মেঘবালকরা কই? এই সামান্য অবকাশে যেন অনন্তবিরহবেদনা তাদের ঘিরে ধরলো।
এই বেদনা যেন অন্যরকম সুরভিতে আমোদিত যা স্বর্গের অনন্তমিলনেও নেই।এযে অসহ মধুর,বেদনাবিধূর।এ বড় দুর্লভ অনুভূতি,নিমেষে হারায়।