পর্ব ২:
পরপর দুটো চমৎকার ক্লাস কাটতেই অলকেশ ফাজলামি শুরু করলো।ছফুটের উপর লম্বা অলকেশ এসে বললো,"তোর,শুভাশিস,কৌশিক,,সবার চেহারা থেকে অংক করার সময় একটা জ্যোতি বেরোয়।" আমি ঠোঁট নাড়িয়ে নিঃশব্দ একটা গালি দিতেই ও কানে হাত দিয়ে বললো,"এই গালিটা দেখলাম,শুনলাম না"।আমি হাসতে না হাসতে বাংলা শিক্ষক তপনবাবুর
প্রবেশ।দীর্ঘদেহী তপনবাবু শীর্ণ ,তীক্ষ্ণ নাক মুখ আর অতি উজ্জ্বল চোখে্র মালিক।ঠোঁটে লেগে আছে মৃদু হাসি।পড়াতে পড়াতে পাশে বসে থাকা ছানা ও্ররফে
অমিতকে হঠাৎ ই " ইন্দ্রজিতের যজ্ঞগৃহে লক্ষণ" নিয়ে প্রশ্ন করলেন।ছোট্টখাট্টো চেহারার অমিত আক্ষরিক অর্থে ই প্রশ্নটাকে মাথার উপর দিয়ে পিছনে্র সারিতে যেতে দিল। স্যার বললেন ,"উঠে দাঁড়া,প্রশ্নটা তোকে করেছি এতে আর সংশয় নেই তো?" অমিত হ্যাঁ বা না'র মাঝে দোদুল্যমান হয়ে ছাদ ,সিলিং ফ্যান, বেঞ্চ
সবজায়গায় উত্তর খুঁজতে খুঁজতে হতাশ হয়ে বোবার শত্রু নেই এই আপ্তবাক্যের উপর ভরসা রেখে চুপ হয়ে থাকলো।বৃথা কালক্ষেপ না করে স্যার অমিতের পিঠে দ্রুত গুমগুম করে হস্তক্ষেপ করে অমিতকে বেঞ্চে দাঁড় করিয়ে দিলেন।দুচারটা কিলের উপর দিয়ে বিপদ কাটলো ভেবে অমিত যারপরনাই খুশী হয়ে অসতর্কভাবে হেসে ফেললো।স্যার দেখলেন এবং বইটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন।বললেন"অমিত কেউ কেন এতদিন তোকে বলে দেয়নি যে হাসলে তোকে ঠিক বেবুনের মত দ্যাখায়?"। অমিতের মুখ বন্ধ হলেও অসতর্ক প্রত্যক্ষদর্শী আমার মুচকি হাসি স্যারের নজরে পড়ে এবং সংক্ষিপ্ত মন্তব্য," হাসলে তোকে ঠিক ওরাংওটাং এর মত দেখায়"।যথারীতি ঘন্টা পড়ে গেল।অনেক খুকখুক হাসি কাশিতে পরিবর্তিত হতেই,"বাঁদরদের ও আজকাল কাশি হয় এমনতো জানা ছিল না "গোছের মন্তব্য করে স্যারের প্রস্হানে্র পর সারা ক্লাস বেবুন বাঁদর ওরাংওটাং এর সাথে মিল অমিল নিয়ে ফাজলামি শুরু করলো। অমিত হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বেঞ্চ থেকে নেমে পড়ে চুপচাপ বসে থাকলো।সম্ভবত বেবুনের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়াটা ওকে বা ওরাংওটাং এর সাথে মিল আমাকে ভবিষ্যতে আয়নার সামনে বারবার দাঁড়াতে প্ররোচিত করেছিল।একটু পরে "টিফিন টিফিন " আওয়াজে চমকে দিয়ে দীনেশদার প্রবেশ ।মুড়ি বোঁদে বা ব়ুন্দিয়ার প্যাকেট নিতে নিতে সজলের মন্তব্য"এর থেকে দুধমুড়ি দিতে পারতো!"দীনেশ দা বললো"বাটি কোথায় পাবা।হেড স্যারকে বলবো।" সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় সজলের মুখটা বেবুনের মত হয়ে গেল।"দুগ্ধপোষ্য সজল" সবাই একসাথে ঘোষণা করলো। "জলদুধ একসাথে",আমার সংযোজন।
বেলা তিনটার পর ছুটি।বাইরে বেরোতেই শীতে্র পড়ন্ত রোদের ছায়ায় অমল বিকেল।তিস্তার নদীবাঁধের দিক থেকে ধেয়ে আসা ঠান্ডা হাওয়ায় শীতের তীক্ষ্ণ কামড়।আকাশ নীলিমায় নীল।কয়েকজন বন্ধু মিলে গিয়ে বসলাম তমালদের কোয়ার্টারসের সিঁড়িতে।ঠিক রাস্তার পাশে।চাঁদু একটু উশখুশ করছিল।এমনি সময় তারা হেঁটে আসে।লালপাড় সাদা শাড়ির মনকাড়া চলনে। আমার মন্তব্য,"হায় মুনিয়া পাখিটা!" সে ঘাড় ঘুরিয়ে উজ্জ্বল চোখে দ্যাখে।
কবিতার কটা লাইন মনে ভেসে যায়।
"তুই মলয় বাতাস হয়ে
উড়াস আমায়
পথের ধূলোর মতো,
কে তোকে বাসবে এতো ভালো
যত ভালো বাসছি আমি তোকে?"
তমালের গা জ্বালানো মন্তব্য,"চাঁদু তুমি আস্ত হাঁদু"।
চাঁদু মরিয়া হয়ে পিছনে হাঁটা লাগাল।আমি "বোকাটা শহীদ হল " বলে উঠে দাঁড়ালাম।তমাল সজল হাত টেনে ধরল,"দাঁড়া,ওকে আসতে দে"।
মিনিট দশেক পরে চাঁদুর প্রত্যাবর্তন।
কি ব্যাপার কি ব্যাপার বলে সবাই প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল।
চাঁদু মুখটা প্যাঁচার মত করে বলল,"মাইরি বলছি,কেসটা কি বুঝতেই পারলাম না।কাছাকাছি যেতেই পাবলিক ঘুরে দাঁড়াল আর প্রথমে কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো,তারপর বলে,, নিজে না এসে তোমাকে পাঠালো বুঝি?" বলেই আবাউট টার্ণ। বুঝলি কিছু?" সবাই মাথা নাড়লো।
একঝাঁক বুনো হাঁস কি পথ হারালো?
মনে পড়লো,,,,,
"পূ্র্ব আকাশ অনন্ত
তুমি আসতেই বজ্রাঘাত
আকাশ উথালপাথাল
বাতাসে চাঁপার গন্ধ"
অন্যমনস্ক সাইকেলের চাকা গড়ালো বাড়ির দিকে।
No comments:
Post a Comment