Tuesday, 3 January 2017


কল্পনা:২

এক <

মধ্যাকাশে সূর্যদেব অধিষ্ঠিত হলেন।
আকাশ নীলাভ ও দীপ্তিমান হয়ে উঠল।
দেবপ্রভাতেজে সৃষ্টি ক্রমশ
তপ্ত হয়ে উঠল।
আসমুদ্রহিমাচল ভূমি সূর্যের প্রখর তেজে বাষ্পহীন হয়ে শ্যামলিমা ত্যাগ করল।
হরিদ্রাবর্ণ বৃক্ষের দল বাষ্পমোচন করে
বৃথাই বনভূমিকে সজল রাখবার প্রয়াসবর্তী হল।
সৃষ্টি তাপের প্রভাসে নিদ্রালু হয়ে উঠল।
বনভূমিতে বিচরণকারী পশুর দল
পত্রবহুল বৃক্ষের ছায়ায় আশ্রয় নিল।
শ্বাপদের দল ক্ষুধাবিমুখ হয়ে বিশ্রামরত হল।
পক্ষীর দল দ্বিপ্রহরের তাপ পরিহার করতে
বৃক্ষশাখায় পাতার অন্তরালে ঠাঁই খুঁজে নিল।
জলধারা গতি হারাল।
বারংবার জলসিঞ্চনেও কৃষিজীবির কর্ষিতক্ষেত্রে ফসলের অঙ্কুরোদ্গম বিলম্বিত হল।
তপোবনপ্রান্তে গাভীরা ক্লান্ত চরণে গোচারণক্ষেত্র
থেকে দূর হয়ে অসময়ে গোশালা অভিমুখে চলতে আরম্ভ করল।
নিদ্রাতুর আহির বালক সচকিত হয়ে উঠে গাত্রোত্থান করে গাভীকূলকে বৃথাই গোচারণক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা করতে লাগলো।
অবাধ্য গাভীরা অকস্মাৎ ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে গতিবৃদ্ধি করল মাত্র, দিক পরিবর্তন নয়।
হতাশ গোপালক গাভীদলের অনুসারী হয়ে গ্রামাভিমুখী হল।
দিন এখনও অনেক বাকি।
সূর্যের প্রখর তাপ অঙ্গে এখনও জ্বালা ধরায়।

> দুই <

তপোবন প্রান্তে করজোড়ে সমস্ত নারীপুরুষ বালকবালিকারা সমবেত হয়েছে।
পলিতকেশ তপস্বীরা ভূমিতে শ্রেণীবদ্ধ হয়ে উপবেশন করে আলোচনামগ্ন।
এই প্রখর দাবদাহ হতে পরিত্রানের উপায়স্বরূপ তারা সূর্যবন্দনায় মেঘ এবং বরুণদেবের স্তূতিপাঠে মুখর হলেন।
প্রজ্জ্বলিত হোমাগ্নিতে সুগন্ধি যজ্ঞকাষ্ঠের জ্বলনে এবং ঘৃতাহুতিতে অগ্নিশিখা আকাশমুখী হল।
সমবেত মন্ত্রোচ্চারণ দেবকূলের কর্ণগোচর হলেও তারা কোথায়?
ঊর্ধ্বাকাশে দেবলোকে দেবাদিদেব ইন্দ্র অর্কদেবকে প্রভা সংবরনের আদেশ দিলেন।
সাক্ষী রইলেন পর্জন্য, বরুন, বায়ু, নিশা, যম, কাম, ঋতু, দিকপাল ও অষ্টবসুগণ।
সাক্ষী রইলেন দেবগুরু বৃহস্পতি, দেবপত্নীগণ, গন্ধর্ব এবং অপ্সরাকূল।
চিন্তাবিষ্টমুখে সমাসীন ছিলেন ধনাধিপতি যক্ষ কুবের।
করজোড়ে দেবরবি তাঁর অক্ষমতা জ্ঞাপন করলেন।
বললেন, "দেবাদিদেব ইন্দ্র, মার্জনা করবেন।আমি সংরক্ষক মাত্র, নিয়ন্ত্রক নই।ঋতুর বশবর্তী মাত্র।
এই তাপ নিবারণ আমার সাধ্যাতীত।
আপনি পর্জন্যদেবকে আজ্ঞা দিন ধারাপাতের।
তবেই সৃষ্টি শীতল হবে।"
ইন্দ্র উৎসুক চোখে পর্জন্যদেবকে আহ্বান করলেন। করজোড়ে পর্জন্যদেব নিবেদন করলেন, "দেবাদিদেব, আপনি আদেশ করলে এই মধ্যবসন্তেও
আমি বর্ষনের সূচনা করতে পারি।
তবে জলধারার অবিচ্ছিন্ন সরবরাহের জন্য বরুণদেবের আশীর্বাদ চাই।"
জলদেবতা "তথাস্তু" বলে সম্মতিজ্ঞাপন করলেন।
এরপর ইন্দ্র দক্ষিণহস্ত উত্তোলন করতেই
সভাস্হলের গুঞ্জন স্তব্ধ হল।
ইন্দ্র বললেন, "প্রিয় সখা পর্জন্য এবং বরুণ, তোমরা অতীব যত্নের সাথে বর্ষার আয়োজন করো।
দ্রুত সঞ্চালনের জন্য মরুৎদেব তোমাদের সহায়তা করবেন।
আমি স্বয়ং বজ্রবিদ্যুৎসহ সমস্ত বাধা নাশ করবো।
যাও, সৃষ্টিকে রক্ষা করো।"

> তিন <

পর্জন্যদেব তাঁর সহযোগীদের বললেন, "যাও, সমস্ত মেঘকূলকে বলো তাদের জলভারকে
সুসংহত করতে এবং মরুৎধারায় আহরণ করে অবিলম্বে সর্বত্রগামী হয়ে
সমস্ত দিক দিগন্তে মেঘমালার বরষাসজ্জা সম্পূর্ণ করতে।"
"যথা আজ্ঞা" বলে তারা সপ্তসিন্ধুর ওপর দিয়ে দশদিকে ধাবিত হল।
শুভ্রবর্ণ মেঘবালিকা মেঘবালকের দল পুনরায় আনন্দে মত্ত হয়ে কোলাহল করে উঠলো।
তারা করজোড়ে নিবেদন করল, " হে দেব, আমাদের পুনরায় মধুময় হতে আজ্ঞা দিন।
স্মিতহাসিতে পর্জন্যদেব অনুমতি দিলেন।
মেঘবালক মেঘবালিকারা বেনীসংহারপূর্বক পুনরায় পুঞ্জীভূত হয়ে উঠল।
মধুময় শরীর ঘোর কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করতেই মেঘবালক মেঘবালিকারা অন্তরীক্ষময় ক্রীড়াসঞ্চালনে মত্ত হল।খরবায়ু বেগে বইতে লাগলো।
চারিদিক মেঘে ছেয়ে গেল।
দিকপালগণ বিদ্যুন্মালার সজ্জায় শোভাবর্ধন করলেন।স্বয়ং ইন্দ্র ঐরাবতে চড়ে বজ্রবর্ষন করলেন।
মেঘের আড়ালে সূর্যদেব আচ্ছন্ন হলেন।
প্রবল মরুৎধারায় মানুষ পশু বন জঙ্গল পর্বত মরু জলধারা ঝর্ণাধারা এবং সমুদ্র শীতল হল।
হোমাগ্নির আগুনে তপস্বীদের মুখমন্ডল উদ্ভাসিত হল।তারা সহর্ষে জানালেন, "দেবতারা প্রার্থনা শুনেছেন। বর্ষা আসন্ন।
যাও তোমরা, দ্রুত প্রস্তুত হও ধারাপাতের জন্য।"
মেঘবালক মেঘবালিকারা ক্রীড়াচ্ছলে প্রথমে বিন্দুবারিপাত দিয়ে শুরু করলো।
বৃক্ষপত্র ও ভূমির উপর বারিবিন্দুর পতনে স্নিগ্ধশব্দছন্দের সূচনা হল।
জলাশয় ও সরোবরের উপর বিন্দুবারির ধারাবাহিক পতনে অপূ্র্ব মধুর শব্দছন্দের সূচনা হল।
ধীরে ধীরে বরষার গতি এবং শক্তি বৃদ্ধি পেল।
প্রবল হাওয়ায় জলকণা ভাসতে ভাসতে দৃষ্টি আচ্ছন্ন করলো।
বনের পশুরা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।
নিদ্রামগ্ন শ্বাপদেরা উঠে দাঁড়িয়ে হুংকার দিয়ে খুশির প্রকাশ করল।
সমস্ত বন এবং জনপদ ভিজতে লাগল।
প্রথম বর্ষার পতনে ভূমি স্নিগ্ধ হয়ে
তার সুগন্ধ ছড়িয়ে দিল।
কৃষকের স্বপ্ন সবুজ সজল হয়ে উঠল।
সমস্ত বৃক্ষকূল জল ও হাওয়ার অভিঘাতে
মহানন্দে থরথর করে কাঁপতে লাগলো।
মেঘবালক ও মেঘবালিকার দল মহাকলরবে ক্রীড়ায় মত্ত হল।
দীর্ঘ তাপপ্রবাহের শেষে সমস্ত পৃথিবী ধারাস্নানে সজীব হয়ে উঠলো।

> চার <

সমস্ত জগৎ মুহুর্মুহু বজ্রপাতের এবং অশনিসংকেতের দোলায় চকিত হয়ে উঠল।
অপরাহ্নে বর্ষা শেষ হল।
বৃক্ষশিখর থেকে তখনও বিন্দু বিন্দু জলকণা নিচে ঝরতে লাগলো।
সমস্ত শ্যামলিমা যেন ফিরে এল কোনো যাদুমন্ত্রবলে।
সমস্ত নদীকন্দর ঝরনাধারায় পূর্ণ হল।
সমুদ্র হল উত্তাল।
ইন্দ্রদেব সপারিষদ স্বর্গাভিমুখী হলেন।
বরুণ ও পর্জন্যদেব তাঁর অনুগামী হলেন।
সূর্যদেব সবাইকে সহায়তার জন‍্য ধন‍্যবাদ জানিয়ে অস্তগমনের জন্য প্রস্তুত হলেন।
সপ্তাশ্ববাহী রথ ধীরে ধীরে নিম্নগামী হল।
মেঘবালক মেঘবালিকারা
অস্তগামী দিবাকরকে করজোড়ে বিদায় জানালো।
ঊর্ধ্বাকাশে বসন্তপূর্ণিমার বার্তা নিয়ে
দেবশশী উদিত হলেন।
ছিন্নমেঘের মধ্য দিয়ে তাঁর বিচরণের সময়
আলো আঁধারির পর্যায়ক্রমিক ছায়ায়
পৃথিবী মগ্ন হল।

দিবাবসানে সন্ধ্যার আগমনে নগর জেগে উঠল।
বর্ষাস্নাত সন্ধ্যায় নগরীর কোণে কোণে
সন্ধ্যাদীপ জ্বলে উঠল।
শঙ্খধ্বনিতে চারদিক মুখরিত হল।
সমস্ত নাগরিক উদ্যান গৃহাঙ্গনে
পুষ্পের সৌরভ ছড়িয়ে পড়ল।
বসন্ত বিপুল হরষে পদার্পন করলো।

☆▪☆▪☆▪☆▪☆▪☆▪☆▪☆

No comments:

Post a Comment