পর্ব:৩
লেখাটা কিছু ফিকশন কিছু স্মৃতিচারণা।বড় ভালবেসে লেখা জলশহরের একটা সময়কে ধরার জন্য।কাউকে আঘাত দিলে মাপ চাইতে দ্বিধা নেই।
^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^
পর্ব:৩
অমল কিশোরকাল ভেসে গেছে বহুদূরে
নক্ষত্রলোকের কোন অন্ধকার ছায়াকোনে
ছুঁতে চাই একবার পুরোনো মায়ার টানে,
কিছু কি পাবো না ফিরে?
যা গেছে তা কি ইতিহাস হবে
শুধু?
তার চেয়ে ভাল যদি উপকথা হয়ে থাকে
স্মৃতির তিমিরে।
১৯৭১। সে এক উত্তাল সময়।রোজই প্রায় স্কুল ছুটি হয়ে যায়।কখনো প্রেয়ার লাইনে বিপ্লবের গান গাইতে হয়।কখনো যুব কমরেডদের আদেশে ক্লাস বয়কট।গণ আন্দোলনের যে অপরিণত মুখগুলি সামনে আসতো খুব ভেবেচিন্তে কাজ করবার দুর্নাম তাদের ছিল না।তবে আমাদের ছুটির আমেজ খারাপ লাগত বললে বাড়াবাড়ি হবে,,,তবে উদ্বেগের এক দমচাপা বাতাবরণ তৈ্রী হচ্ছিল।শিক্ষকমশায়রা দৃশ্যত এই পরিস্হিতিকে মন থেকে মানতে পারছিলেন না।সেই উষ্মা হতাশা তাদের শরীরিভাষায় প্রকাশ পেতো।এমনি সব দিনগুলিতেও জীবন নিজের মত বইতো।
এমন ই এক দিনে এক ক্লাসে সমাজবন্ধুদের অবদান বিষয়ে পাঠ।সেদিনের বিষয়বস্তু "গোয়ালা"।
যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়।স্যার পাঠ পর্যালোচনার সময় অমিতকেই পাকড়াও করলেন।প্র্শ্ন ছুটে এল,"অমিত-বল তো গোয়ালারা কি করে?"
এরকম অন্যায় অবিচারের জন্য অমিত প্রস্তুত ছিল না।আমার দিকে তাকিয়ে ওর ভাবখানা -তুই বল না!
স্যারের দিকে তাকিয়ে ও একটা রফায় আসতে চেষ্টা করল"কালকে পড়িনি স্যার"।স্যার বললেন"পড়ার আবার কি দরকার বেটা গর্দভ। চিন্তা কর।" অনেকক্ষণ ভেবে অমিত কূলকিনারা করতে পারলো না।শেষে স্যার সদয় হয়ে একটা প্রশ্ন করলেন।গোয়ালা সকালে উঠে কি করে? অমিতের চটজলদি উত্তর,"দাঁত মাজে,মুখ ধোয়"।স্যার এমন অভাবনীয় উত্তর পেয়ে বললেন"তার পর?"।অমিত বিজয়ীর মত উত্তর দিল "চা খায় স্যার"।স্যার "তারপর?"।উনিও শেষ দেখেই ছাড়বেন।অমিত তখন উজ্জীবিত,"গোয়ালে যায়,গোরুকে খেতে দেয়।" স্যার "next?". অমিত সগর্বে ঘোষণা করে ,"দুধ দোয়।তারপরে ছানা কাটে।"
সারা ক্লাস এবং স্যার হাসিতে ফেটে পড়েন।এরপর অমিতের নাম ছানা হওয়াটা একটা অনিবার্য ঘটনাপ্রবাহ। এবং ছানা সম্বোধন অমিত সগর্বে আত্মস্হ করেছিল।তবে সমাজবন্ধুদের নিয়ে অমিতের অতুলনীয় চিন্তাভাবনা নিয়ে জটিলতা আর বাড়ে নি।কারণ আন্দোলনের অপ্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ বার্ষিক পরীক্ষা না দিয়েই আমরা ষষ্ঠ শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে যাই।১৯৭১
সারা বছর আমি ও আমার পরিবার দমচাপা উৎকন্ঠার মধ্য দিয়ে কাটাই।হঠকারী হত্যার উৎসব শুরু হলো।সন্ধ্যায় বই নিয়ে বসলে উৎকর্ণ হয়ে থাকতাম কখন সদর দরজা খোলা বন্ধ করবার আওয়াজ এবং পরপর সাইকেলের ঘন্টা আর বাবার গলার আওয়াজ পাই।বইয়ের পাতায় চোখ থাকলেও মন থাকতো না।তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালাতে গিয়ে শাঁখে ফুঁ দেওয়ার সময় শঙ্কায় মার বুক নিশ্চিত ভাবে কাঁপতো।আমাদের আঁচলের তলায় আগলে রাখবার দুর্বার সাহস,,সেও তো এক অন্য বিপ্লব।রোজ সন্ধ্যায় আমার পুলিশ অফিসার বাবা বাড়িতে অক্ষত অবস্হায় ফিরে এলে আমার মাকে চোখের জল মুছতে দেখতাম এবং অন্ততঃ সেই দিনের মত ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিতাম।চীনের চেয়ারম্যানের কাছে এই সমস্যাভাস নিশ্চয়ই পৌঁছনোর কোন সুযোগ ছিল না।তবে সবাই মিলে যখন প়িঁড়িতে বসে মায়ের যত্ন মাখানো রান্নার স্বাদ নিতাম ,তখন আরেকটু মাছ বাবার পাতে তুলে দিতে গিয়ে মায়ের খুশীটা রাতের জ্যোৎস্নার মত ই অমল হয়ে উঠতো।রাতে বাবার পাশ ঘেঁসে শুয়ে পড়তেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে ভাবতাম যে কালকের দিনটাও যেন এমনি ভালো হয়।
No comments:
Post a Comment