Tuesday, 3 January 2017


পর্ব ৫
সময় হয়েছে কথা বলার
নৈঃশব্দ্য ঝেড়ে ফেলে
সময় হয়েছে হাত ধরার।
^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^
ষান্মাসিক পরীক্ষা শেষ।শেষদিন পরীক্ষা শেষে
বন্ধুদের জটলা।বর্ষা এবার আগেই শুরু হয়েছে।সকালে ঘুম ভাঙ্গে বরষাধারার অবিরাম পতনের শব্দে।
সারাদিন চলতেই থাকে বৃষ্টি।কখন ও ঝিরঝিরে বৃষ্টি হাওয়ায় ভাসে।কখনো ছন্দে বাজে রিমঝিম।কখনো অঝোর ধারায় সব ধুয়ে যায়।টিনের চালের উপর বর্ষাধারার পতনের শব্দ এক মধুর ছন্দে বাধা।আম জাম কাঁঠাল গাছের ঘেরাটোপের উপর মেঘ গলে জল পড়তেই থাকে।প্রথমে গাছের কান্ড বেয়ে জল গড়াতে
থাকে।তারপর পাতার ফাঁক দিয়ে প্রথমে টুপটুপ পরে ঝুপঝুপ করে করে জল গড়াতে থাকে।গাছের ডালে বসে থাকা কাকেরা কেমন ভিজে চুপচুপে হয়ে গুটিশুটি হয়ে বসে আছে।বাতাসে ঠান্ডা শীত শীত ভাব।সমস্ত জলশহরটাই যেন উঠোনে মেলে রাখা কাপড়ের মত বর্ষায় ভিজে চুপচুপে।বন্ধুরা ক্লাসের মধ্যেই বসে গল্প জুড়ে দিই।স্বভাবত ই গাভাসকর বিশ্বনাথ বেদী প্রসন্ন থেকে সেই ফুটবলার গৌতম, সুরজিৎ, প্রসূন, জলশহরের সুভাষ, টেনিসের বিজয় অমৃতরাজ থেকে গড়িয়ে জলকিশোরীদের গল্পে ঢুকে পড়ে।লাল পাড় নীল পাড় কমলা পাড়ের প্রভাব বাড়তে থাকে।বঙ্গ বালিকাদের আয়তচোখের কোন তুলনা নেই সেটা কিশোরবাংলা নির্দ্বিধায় মেনে নিল।কেউ কেউ বালিকা বধূ দেখে ফেলেছে।কিশোরবিবাহের রোমান্সের পক্ষে সবাই বেশ অনুকূল মত দিল।সবার ই একটু শ্রীমান পৃথ্বীরাজ
হওয়ার খুব বাসনা,কিন্তু একহাতে তালি বাজেনা আর সংযুক্তা হয়ে ওঠার মত কোন যুতসই পাত্রীর বড় ই অভাব।বালিকা বান্ধবী র চাহিদা এবং জোগানের মধ্যে প্রায় অযৌক্তিক ফারাক আমার বন্ধুদের যৎপরোনাস্তি হতাশ করে এবং এই ব‍্যাপারে জলবালিকাদের উদ‍্যোগের অভাব বা বিরোধিতা কিম্বা অনীহা অনেকের কাছেই উত্তরোত্তর পীড়াদায়ক হয়ে উঠছিল।আসা যাওয়ার পথে পছন্দ আর আলাপের কোন তালমিল ছিল না।কয়েকজনের অভিজ্ঞতা বড় ই হতাশাজনক।।তাই শেষ পর্যন্ত ভূতের গল্পে ঢুকে পড়তেই দীনেশদার প্রবেশ এবং ঘোষণা, "এবা্র বাড়ি যাও।ঘরটর বন্ধ করি।" গল্পকথক সজল খুব হতাশ হয়ে পড়ে।এতগুলো শ্রোতাকে বাগে পাওয়া সততই দুর্লভ সুযোগ।বৃষ্টি থামার সাথেই মনোযোগী শ্রোতারা দ্রুত গাত্রোত্থান করে।সজল দুএকজনকে শোন না শোন না বলে শেষ চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দেয়।
একজন বলল যে, "হাসলে অমিতকে বেবুন, উৎপলকে ওরাংওটাং আর আমাদের কে জানে কিসের মত দেখায়!" অলকেশ সিদ্ধান্তে এল যে আমাদের গম্ভীর হতে হবে, হেসে কিছু হবে না।
এরপর আমরা সদলবলে বেরিয়ে পড়ি ঝিরঝিরে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে।আগামী কয়েকদিন তালাবন্ধ থাকবে এই ঘর।আমাদের ছুটি।পথে নামতেই ঝেঁপে বৃষ্টি এলো।
আমি আর চাঁদু নদীবাঁধের উপর বসে।সামান্য দূরে তিস্তা ফুঁসছে অবাধ্য মেয়ের মত।আমরা ভিজে যাচ্ছিলাম।প্রথমে মাথা ভিজে জল জামার কলারের ফাঁক দিয় শরীরে ঢুকে এলো।তারপর প্রবল বর্ষণে যেমন শুকনো মাটি ভিজে উঠতে থাকে তেমনি আমরা দুই কিশোর নদীবাঁধের ওই উথালপাথাল হাওয়ার মধ্যে বৃষ্টিতে ভিজতে লাগলাম অনন্তকাল ধরে অনন্তধারায়।তিস্তার জলে হাওয়া আর বরষাধারা অস্হির ঢেউ তুললো আর এই দুই কিশোরের অবিমৃষ্যকারিতায় যৎপরোনাস্তি বিরক্ত হয়ে বারবার ঢেউ হয়ে নদীবাঁধের উপর আছড়ে পড়ে বিরক্তি প্রকাশ করতে লাগলো।
হঠাৎ বৃষ্টি ধরে এলো।কোথাও যেন শেষ বিকেলের ম্লান আলোর ধারায় ভিজে চারদিক কেমন মায়াকাননের মত স্বপ্নময় হয়ে উঠলো।হঠাৎ ই লেজ ঝোলা ফিঙে.রা ভেজা কাকদের দলবেঁধে হয়রান করতে শুরু করলো।মৃদু রোদে অনেক ফড়িং এর দল উড়তে লাগলো।ভেজা ঘাসের ওপর রোদ পড়ে চিকমিক করতে লাগল। এক পলকেই এক নৈঃশব্দ্যপীড়িত ভুবন মনোহারী শব্দজালে আচ্ছন্ন হয়ে উঠল।হঠাৎ কেমন মনের ওপর থেকে একটা পর্দা সরে গেল।স্বল্পসময়ের জন্য হলেও মনে হল এই আমি নদীবাঁধ তিস্তা বরষাধারা এই মাতাল হাওয়া এই বয়ে যাওয়া জলের ধারা যেন বারবার কোটি কোটি বছর ধরে একই দৃশ্যপট ঘটনার অলৌকিক পুনরাবৃত্তি।মনে হলো এই প্রথম নয়, এই নদীবাঁধ অগণ্যবার আমাদের বরষাধারায় সিঞ্চিত
হবার সাক্ষী।এই চলার প্রতিটি পল যেন বারবার ফিরে আসে। এ আসা অবিরাম অন্তহীন আবহমানকাল ধরে চলেই আসছে।কি জানি কিসের লাগি প্রাণ হায়হায় করে উঠল!! সে বেদনা অসহ মধুময়।ভুবনজোড়া এই আনন্দপসরা দুহাত বাড়িয়ে যেন ওই ভরা তিস্তার ওপার থেকে আকুল হয়ে ডাকতে থাকে আয় আয় বলে।
কি করি কি করি,,,,!!
এ হৃদয় বিশ্বভুবনের পুরো রস কি আত্মস্হ করতে পারে?! হৃদয়ের একূল ওকূল দুকুল ভেসে যায় যে! এই অধরা আনন্দ অসহ হয়ে ওঠে,,,,,,!!

"তুমুল ধারাপাতের শেষে
রোদ উঠেছে মেঘ কেটেছে
মাথার উপর উঠল জেগে
সাতরঙা ওই অমল আকাশ
কোমল ভারী"

ফিরে আসি নিজের মধ‍্যে।আশপাশ থেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নিজেকে
যতটা পারি দুহাত দিয়ে কুড়িয়ে ফেরৎ নিই।তবুও কিছু কি নদীবাঁধে ফেলে আসিনি? আমার আমির অনেকটাই ওইখানে ছেড়ে আসা।

ফিরে আসবার সময় রাস্তাঘাট শেষ বিকেলেই নিঝুম রাতের মত জনশূন্য ছিল।বাড়ি ফিরে মায়ের জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে জামাকাপড় ছেড়ে স্নান করে শুকনো জামাকাপড় পরে গরম খাবার গোগ্রাসে গিলে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ি। ঘুমের মধ্যে তলিয়ে যেতে যেতে মায়ের হাতের ছোঁয়া পাই।খুব দূর থেকে ক্ষীণ গলার আওয়াজ কানে ভেসে আসতে থাকে।তারপরে চাঁদুর গলা পাই।ভিজে মাঠে চাঁদুর পা থেকে বলটা আমার পায়ে।নিজেদের গোলের দিকে মুখ করে বলটা ধরে বাঁদিকে ঘুরতেই একজন কেটে গেল।তারপর বল পায়ে নিয়ে গতি বাড়িয়ে হাফলাইন।বল পোষা কুকুরের মত বাঁপায়ে।দুপাশ থেকে দুজন ধেয়ে এল।ছোট্ট টোকায় বল সামনে ফেলে লাফ দিয়ে দুজনের মাঝদিয়ে পেরিয়েই দেখি প্রায় আলিঙ্গনে্র দূরত্বে হিংস্র গোলকিপার।দুহাত বাড়িয়ে সে ঝাঁপায়।ডানদিক থেকে শুভাশিস দৌড় শুরু করে।বল বাড়াই কোনাকুনি ডানদিকে।আমি মাটিতে পড়ি গোলকিপার আমার উপরে।যন্ত্রণা চিৎকার "গো ও ও ও ও ও ল"।শুভাশিস বল ঠেলছে গোলে।রেফারীর বাঁশি।খেলা শেষ।
সকালের শুরু মার ডাকে... "ওঠ, উঠে পড়। আর কত ঘুমোবি?"
আজ ছুটির দিন।উঠে পড়তেই দিন শুরু।সব সেরে বসে পড়লাম "ইয়ার্লিং" নিয়ে।মানুষের বন কেটে নূতন বসতি তৈরীর আমেরিকান পটভূমিতে এক বালক আর এক হরিণছানার সখ্যতার গল্প।মনে আছে বেশি করে চমৎকার কাহিনীর জন্য তো বটেই, আরও কারণ এর পরেই একসাথে পড়ি জীবনের সেরা উপন্যাস পথের পাঁচালী, অপরাজিত, কাজল একসাথে।তার কিছুদিন পর উথালপাথাল প্রেমগাথা, তুঙ্গভদ্রার তীরে। বড় হয়ে গেলাম সপ্তপদী আর সাতপাকে বাঁধা দেখে। মিলন আর বিরহের দুই অনন্ত দৃশ্যপট। জলবালিকাদের বড়ই অকিঞ্চিৎকর হেলাফেলার দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করলাম। রোদজ্বলা দুপুরে সুর তুলে নুপূরে রুবি রায় তখন আকাশে বাতাসে। নতুন ধারায় মজেছে সবাই। তুমুল বিষাদজ্বালা নিয়ে পাশে এলেন জীবনানন্দ। ভাসিয়ে নিয়ে গেল নীললোহিত আর কালকূট। আর সারা জীবনের সঙ্গী আসিমভ, ক্লার্ক এবং অবধারিতভাবেই ব্যোমকেশ।আর খুব কাছের মানুষ আর অনির্বচনীয় ভাষার যাদুকরী লীলা মজুমদার বোধহয় রসবোধের সাগরে ডুবিয়ে দিলেন। আর অন্তরের অন্তরাত্মায় ছেয়ে গেলেন রবীন্দ্রনাথ। মেধা, মনন, এবং অনুভূতির মিশেলে তিনি অন্য মানুষ।মন
আমার কি চায়?

No comments:

Post a Comment